8 September 2017 News

গ্রেন্তার করুন স্ত্রী -মেয়েকে নৃশংস খুন করে থানায় হাজির স্বামী

অন্ডাল: ঘড়িতে তখন ভোর ৫টা৷ অন্ডাল থানার পুলিশকর্মীরা তখনও কেউ চায়ের কাপে চুমুক দেননি৷ আচমকাই এক ব্যক্তি হন্তদন্ত হয়ে থানায় ঢুকে তাকে গ্রেন্তারের দাবি জানাতে থাকে৷ হতভম্ব হয়ে পড়েন পুলিশকর্মীরা৷ এর পর কিছুটা ধাতস্থ হয়ে ওই ব্যক্তি জানায় , স্ত্রী ও মেয়েকে খুন করে থানায় আত্মসমর্পণ করতে এসেছে সে৷ মাধবপুর কোলিয়ারির ১১ নম্বর আবাসনে দেহ দু’টি পড়ে আছে বলেও জানায় সে৷ তত ক্ষণে প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে তপন রুইদাস নামে ওই ব্যক্তিকে লকআপে ঢুকিয়ে মাধবপুর কোলিয়ারির দিকে রওনা হন পুলিশকর্মীরা৷ ঘর খুলে একটি খাটের মধ্যে মা -মেয়ের ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার করেন তাঁরা৷ জোড়া খুনের ঘটনায় এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে৷ পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে , মৃতদের নাম পদ্মা রুইদাস (৩৮ ) ও পাপিয়া রুইদাস (১৭ )৷ তপনের আরএক মেয়ে পায়েল দুর্গাপুরে একটি কলেজে পড়াশোনা করেন৷ খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান কমিশনারেটের পুলিশ কর্তারা৷ বৃহস্পতিবার ধৃতকে দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে তোলা হলে বিচারক ১৪ দিন পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন৷ ডিসিপি অভিষেক মোদী বলেন , ‘তপন রুইদাস তার স্ত্রী ও মেয়েকে খুনের কথা স্বীকার করেছে৷ কাটারি ও হাতুড়ি দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে৷ খুনে ব্যবহূত সেই অস্ত্র দু’টি বাজেয়ান্ত করা হয়েছে৷ ঘটনার তদন্ত করে দেখা হচ্ছে৷ ’প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে , অভাবের কারণে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন পদ্মা৷ স্বামীর এক বন্ধুর কাছে কিছু টাকা ধার করেন তিনি৷ এ ছাড়াও বেশ কিছু গণ্ডগোলের জেরে তপনের কাছে ডিভোর্স চাইছিলেন পদ্মা৷

এর পরই স্ত্রী পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়েছে বলে সন্দেহ করতে শুরু করে তপন৷ আবার মেয়েরাও মাকে সমর্থন করায় মানসিক ভাবে কিছুটা বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে সে৷ তার জেরেই স্ত্রী ও মেয়েকে খুন বলে প্রাথমিক ভাবে পুলিশের অনুমান৷ তবে বড় মেয়ে পায়েল বাড়িতে না থাকায় তিনি বেঁচে যান৷ এ দিন পায়েল বলেন , ‘আমি পড়াশোনার জন্য দুর্গাপুরে থাকি৷ বাড়িতে থাকলে বাবা আমাকেও খুন করত৷ বাবা মানসিক বিকারগ্রস্ত ছিল৷ প্রায় দিনই মাকে মারধর করত৷ আর বলত , খুন করে দেব৷ কিন্ত্ত শেষ পর্যন্ত সত্যিই খুন করে দেবে ভাবতে পারিনি৷ ’খুনের কথা স্বীকার করে তপন জানায় , ‘বর্তমানে আমার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না৷ আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে স্ত্রী ১০ হাজার টাকা ধার করেছিল৷ আমি সেটা মেনে নিতে পারিনি৷ সম্প্রতি স্ত্রী আমার কাছে ডিভোর্স চাইছিল৷ মেয়েরাও মাকে সর্মথন করছিল৷ তাই মাথা ঠিক রাখতে পারিনি৷ স্ত্রী ও এক মেয়েকে কুপিয়ে খুন করেছি৷ ’জানা গিয়েছে , বুধবার গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় স্ত্রী পদ্মা ও মেয়ে পাপিয়ার গলায় কাটারি দিয়ে কোপ মারে তপন৷ এর পর মৃত্যু নিশ্চিত করতে হাতুড়ি দিয়ে দু’জনের মাথায় আঘাত করা হয়৷ এর পর ফের কাটারি দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপ মারে শরীরে৷ দু’জনেরই হাত কেটে দেওয়া হয়৷ তবে তপনের কাছে এটাই প্রথম খুন নয়৷ পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে , ১৯৯৮ সালে ১৪ অগস্ট তপনের ভাই উত্পল রুইদাস খুন হন৷ তাতে ১৪ জন অভিযুক্তের সঙ্গে তপনের নাম জড়ায়৷ সেই সময় জেলও হয় তপনের৷ পরবর্তী সময়ে পরিবারের লোকেরা মামলা প্রত্যাহার করে নেন৷ স্কুল ও কলেজ জীবনেও একাধিক অপরাধমূলক কাজের অভিযোগ আছে তপনের বিরুদ্ধে৷

পদ্মার বাপের বাড়ি বুদবুদ থানার চাকতেঁতুল গ্রামে৷ প্রায় ২২ বছর আগে অন্ডালের কাজোড়া এলাকার মাধবপুর কোলিয়ারির বাসিন্দা তপনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়৷ পেশায় গৃহশিক্ষক তপন গ্রামে কোয়াক হিসেবে চিকিত্সাও করত৷ সম্প্রতি তার কাছে খুব একটা ছাত্র আসছিল না৷ পদ্মার ভাই বিজয় ওঝা বলেন , ‘দিদির বিয়ের সময় আমি ছোট ছিলাম৷ জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দিদি -জামাইবাবুর মধ্যে গণ্ডগোল দেখছি৷ দিদিকে বাড়ি থেকে বাইরে বেরোতে দিত না৷ সব সময় সন্দেহ করত৷ মারধর করত৷ অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মাস দু’য়েক আগে দিদি আমাদের বাড়িতে চলে এসেছিল৷ দিন চারেক আগে জামাইবাবু এসে দিদি ও ভাগ্নিকে নিয়ে যায়৷ কিন্ত্ত এ ভাবে খুন করবে ভাবতে পারিনি৷ আমরা দোষীর শাস্তি চাই৷ ’ মেয়ে ও নাতনির মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর থেকে কার্যত বাকরুদ্ধ হয়েছেন পদ্মার মা আরতি ওঝা৷

Source: Eisamay